Relationship Guide: আপনিও কি টক্সিক সম্পর্কে আছেন, কীভাবে বুঝবেন? সাহায্য করলাম আমরা
সম্পর্ক কী? সেটা কি শুধু একজন প্রেমিক বা প্রেমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এর পরিণতি কি সবসময়ই ভালো হয়?নাকি কখনো কখনো ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে এটি আমাদের জীবনে? কীভাবে বুঝব কোনো সম্পর্ক আমাদের জন্য ক্ষতিকর কি না? এই সব প্রশ্নগুলি নিয়েই আলোচনা করব আমরা।
বর্তমানে একটা টার্ম আমরা প্রায়ই আমাদের চারপাশে শুনতে পাই - 'টক্সিক রিলেশনশিপ ' (toxic relationship) । শব্দটি মুখে উচ্চারণ করতে যতটা সহজ মনে হয় বাস্তবে এটিকে চিহ্নিতকরণের কাজ কিন্তু এতটাও সহজ নয়। 'সম্পর্ক' একটি খুব সুন্দর শব্দ। আমাদের আশপাশের প্রত্যেকটি মানুষের সঙ্গে আমাদের একটি সম্পর্ক থাকে, কিন্তু এই সবকিছুর মধ্যে যেটি আমাদের কাছে একটু বেশিই গুরুত্ব পায় তা হল প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে গড়ে ওঠা সম্পর্কটি।
মানুষের মনে প্রেমের অনুভূতি গড়ে ওঠে 'টিন-এজ'-এ। আমাদের মনে অনেক সুন্দর অনুভূতির সৃষ্টি করে। কিন্তু সবসময় সেই স্মৃতির সুখকর হয় না। একটি টক্সিক অর্থাৎ বিষাক্ত সম্পর্ক আপনার জীবনে মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে। অথচ সেটিকে টক্সিক হিসেবে আইডেন্টিফাই করা অথবা বুঝতে পারলেও নিজের প্রিয় মানুষটিকে টক্সিক বলে বিশ্বাস করতে পারা অনেক সময় আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।
আপনি কি টক্সিক সম্পর্কে (toxic relationship) আছেন?
সম্পর্কে ঝগড়া, খুনসুটি, পসেসিভনেস বা কথা কাটাকাটি খুবই স্বাভাবিক। আমাদের জীবনের আর পাঁচটা মানুষের সাথে যেমন আমাদের হয়। কিন্তু একটি টক্সিক রিলেশনশিপে এই স্বাভাবিক জিনিসগুলিই এত অতিরিক্তভাবে হবে যাতে মানসিক অশান্তি, নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের অভাব হতে পারে। এমনকী ডিপ্রেশনের শিকার হতে পারেন আপনি। টক্সিক সম্পর্ক অনেকরকমই হয়। অর্থাৎ, সম্পর্কে সাফার করার ক্ষেত্রে এক একজনের অভিজ্ঞতা এক একরকম। আমরা এখানে সেই দুটি ধরন নিয়ে আলোচনা করব।
আপনি যোগ্য সম্মান পান না
আপনি দেখলেন আপনার পার্টনার আপনার প্রতি লয়্যাল, কোনোভাবে চিট করছেন না। কিন্তু দিনের শেষে আপনি তবুও নিজের কমফোর্ট জোনটা খুঁজে পাচ্ছেন না আপনার পার্টনার-এর সাথে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আপনাকে বা আপনার মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া আপনার মধ্যে একটি ভারাক্রান্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। হয়তো আপনার সঙ্গী সবসময়ই তাঁর নিজের মতামত আপনার উপর চাপিয়ে দিতে ব্যস্ত থাকেন বা তাঁর নিজের বাড়ি বা পরিচিত লোকজনদের সাথে আপনাকে নিয়ে তুলনায় মেতে থাকেন। দুজন মিলে আলোচনা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বা আপনার জীবনে তার আধিপত্য থাকলেও তার জীবনে আপনাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাখা সেটি এরা করেন না। বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় অহেতুক সন্দেহ, নানাপ্রকারে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝামেলা সৃষ্টি করা, নিজের বাড়ির লোকের ইচ্ছা অনিচ্ছা নিয়ম ইত্যাদি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এই ধরনের সম্পর্কগুলির প্রধান অঙ্গ। সম্পর্কে মানিয়ে নেওয়া বা অপরজনের জন্য নিজের জীবনে কিছু কিছু অভ্যাস দুই তরফেই বদলে নেওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু নিজেকে হারিয়ে অন্যের বানানো পাপেট হয়ে চলাটা দিনের পর দিন সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই সমস্ত ক্ষেত্রে প্রধানত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যে সমস্যাটা হয় তা হল, আমরা মনে মনে ভাবি যে আমাদের পার্টনাররা তো আমাদের ঠকাচ্ছে না, আমাকে অপমান করে বা ঝগড়া করে পরে হয়তো সে নিজেই আবার মানিয়ে নিচ্ছে তাহলে এই সম্পর্ক থেকে বেরোনো কি উচিত হবে? উত্তরটা হবে, হ্যাঁ। নিজস্বতাকে হারিয়ে কোনোদিনও বাঁচা যায় না। মানিয়ে নেওয়াটা বা লয়্যালটি সাময়িক। যিনি আপনাকে প্রকৃতই ভালোবাসবেন তিনি আপনাকে সম্মান করবেন। তুলনা করবেন না কোনো কিছুর সাথে। প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে ভালো এবং খারাপ গুণ দুটোই বর্তমান। দুটোকেই একসেপ্ট করে নিয়ে আমরা জীবনে এগিয়ে চলি, আর অ্যাডজাস্টমেন্ট সবসময় দু তরফে হওয়া উচিত, তা না হলে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে গিয়ে ওই সম্পর্কেই নাভিশ্বাস ওঠে। বিশ্বাস এবং একসেপ্টেন্স দুটোই যেকোনো সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি।
কমিটমেন্ট? সেটা আবার কী?
এই ধরনের টক্সিক সম্পর্কগুলো প্রথমটির থেকেও মারাত্মক ক্ষতিকর হয়। এই ধরনের সম্পর্কে আপনি কোনোদিনও কোনো কমিটমেন্ট পাবেন না আপনার সঙ্গীর কাছ থেকে। এরা প্রধানত সমাজের সো কলড এগিয়ে থাকা শ্রেণির মধ্যে পড়েন। এরা শিক্ষিত এবং ভালো পরিবার ও ভালো ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে বিলং করা মানুষও হতে পারেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা নিজের সঙ্গে মানানসই কিন্তু সরল ও সৎ মানুষকেই নির্বাচন করেন সম্পর্কে আসার জন্য। নিজেরা ডিসলয়্যাল থাকলেও অপরদিকের মানুষটিকে লয়্যাল হিসেবে দেখতেই এরা পছন্দ করেন। এরা কোনোদিনও মৌখিকভাবেও কমিটমেন্ট দেন না নিজের সঙ্গীকে এবং মুহূর্তের দুর্বলতায় দিয়ে ফেললেও পরমুহূর্তেই তা অস্বীকার করেন। এরা বেসিক্যালি খুবই ফিকেল মাইন্ডেড হন। জীবনের অন্যান্য দিকে দৃঢ় হলেও এই একটি ব্যাপারে এরা দোলাচলতা করে থাকেন যার ফলে তাঁদের জন্য অন্য কারও কোনো ক্ষতি হলেও এঁরা খুব একটা চিন্তিত হন না সেটা নিয়ে। এরা প্রথমে খুব ভালো একজন মানুষ হওয়ার ভান করে আপনার অ্যাটেনশন ড্র করেন, আপনাকে তাঁর প্রতি দুর্বল করে তোলেন এবং তারপর পিছিয়ে যান। এরা বেশিরভাগই ফ্যান্টাসির জগতে চলে যান কিছু সময় যার ফল স্বরূপ মাঝে মধ্যে এদের মনে প্রেমের উদ্রেক আসে এবং এরা চরম রোমান্টিক হয়ে আপনার জীবনে ফিরে এসে দ্বিগুণ ধাক্কা দিয়ে চলে যান। কখনো যদি এরা বোঝেন যে আপনি এঁদেরকে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাহলে নিজের জায়গা ফিরে পাওয়ার জন্য নানান কার্যকলাপ এঁরা শুরু করেন এবং নিজ লক্ষ্যে সফল হলে এঁরা আবার স্বমূর্তি ধারণ করেন।
এরা কাউকে ভালোবাসতে পারেন না। এঁরা খুব আত্মকেন্দ্রিক হন, এঁরা ভাবেন দুনিয়ার সব কিছু এঁদের নিজেদের নিয়মে চলবে। অন্যকে নিজের দ্বারা চালিত হতে দেখে এঁরা আত্মতৃপ্তি পান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপর থেকে দেখে আপনারা এদের বুঝতে পারবেন না কিন্তু ধীরে ধীরে এদের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। আপনি যদি এই ধরনের সম্পর্কে থেকে থাকেন তাহলে অবশ্যই ভাববার সময় এসেছে। ভাবুন এবং সিদ্ধান্ত নিন।
আরও যে যে ভাবে বুঝবেন আপনি টক্সিক সম্পর্কে আছেন
কয়েকটি সাধারণ সমস্যা যা টক্সিক রিলেশনশিপগুলোয় দেখা যায় তা হল, বডি শেমিং, হিউমিলিয়েট করা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করা, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা, একাধিক মানুষের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। দিনের পর দিন নিজের চেহারা নিয়ে খারাপ কথা শুনতে শুনতে যে কোনো মানুষ যে কোনো সময়ে আন্ডার কনফিডেন্ট হয়ে পড়তে পারেন। কোনো মানুষ তাঁর কাছের মানুষদের থেকে একই কথা রোজ বারংবার শুনতে শুনতে সেটাই বিশ্বাস করতে শুরু করে এবং ফলস্বরূপ তাঁর মনে জন্ম নেয় যে, সে বোধহয় সত্যিই কুৎসিত বা তাঁর মধ্যে এমন কিছু খুঁত আছে যার ফলে সবাই তাঁর দিকে তাকাচ্ছে, হাসছে বা আলোচনা করছে তাঁকে নিয়ে। এর ফলে সেই মানুষটির মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে এবং তার মধ্যে অনেকরকম বিহেভিয়ারাল ডিসর্ডার লক্ষ্য করা যায়। যার ফল দীর্ঘমেয়াদিও হতে পারে।
অনেকসময় দেখা গেছে যে কোনো মানুষ তাঁর পার্টনারের উপর অহেতুক চাপ সৃষ্টি করেন নিজের গোল বা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য। এতে অপর মানুষটির জন্য শুভ কামনা খুব কমই মিশে থাকে। এর পিছনে আসল উদ্দেশ্য থাকে সেই মানুষটিকে নিজের পাশে দাঁড় করালে লোকসমক্ষে যাতে নিজের ইমেজ, স্ট্যান্ডার্ড এবং পজিশন বজায় থাকে। কোনো মানুষ জীবনে কী হবেন তা তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। জীবনসঙ্গীর কাজ হল তাঁকে পাশে থেকে উদ্বুদ্ধ করা, সাহস দেওয়া। কিন্তু চাপ সৃষ্টি করে তাঁকে ইনসিকিওর ফিল করানো নয়।
প্রত্যেকটা মানুষের জন্ম ও বেড়ে ওঠা আলাদা পরিবেশে সেই মতো প্রত্যেকের নিজস্ব পছন্দ ও নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে। কখনোই নিজেকে শ্রেষ্ঠ দেখানো বা অন্যের পছন্দ, অপছন্দের উপর হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। মতামত দেওয়া ও চাপিয়ে দেওয়া এই দুটির মধ্যে পার্থক্য বোঝা উচিত। আবার অনেকসময়ই দেখা যায় একজন মানুষ একইসাথে অনেককটি সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছেন, ধরা পড়ে গেলে এঁরা বলেন যে, শুধুই বন্ধু বা ভালো লাগে, ভালোবাসা নয়। কখনো কখনো প্রাক্তনকে এঁরা এখনও ভালোবাসেন বলে দাবি করেন। যা বর্তমানে তাঁর জীবনে থাকা মানুষটির মনে এক গভীর চাপ সৃষ্টি করে। এই ধরনের মানুষ কখনো কাউকেই ভালোবাসেন না, এমনকি যে প্রাক্তনকে এঁরা ভালোবাসেন বলে দাবি জানান তাঁদেরও না। এঁদের মধ্যে যদি সেই সততা থাকলে তাঁরা একইসাথে একাধিক সম্পর্ক রাখার মতো কাজ করতেন না বা প্রাক্তনকেও তাঁকে ছেড়ে যেতে হত না। তাই অজুহাত ও ফ্যাক্ট এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করতে পারাটা আবশ্যক।
আপনার কী মত?
টক্সিক রিলেশনশিপের মাত্র কয়েকটি দিক তুলে ধরলাম আমরা। কেমন লাগল জানাতে ভুলবেন না। চাইলে নিজের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করতে পারেন গুগল ফর্মে লিখে, নিজের নাম পরিচয় গোপন রেখেই। আপনাদের রেসপন্স-এর উপর নির্ভর করছে আমরা পরের লেখা কী আনব বা কবে আনব। ভালো থাকবেন। সবাইকে ভালো রাখার পাশাপাশি নিজেকেও ভালো রাখবেন।
লিখছেন - প্রিয়াঙ্কা
©️ মনবিলাসী_টিম



Comments
Post a Comment